ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ জুন, ২০২৬ ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন | দেখা হয়েছে ১২ বার
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এখনো দীর্ঘ ও জটিল।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পর এবার শুরু হচ্ছে প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশনের আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠাতে হবে। এরপর তার ভাগ্য নির্ধারণ হবে মূলত আমিরাতের আদালত ও সেখানকার আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে।
রেড নোটিশ মানেই চূড়ান্ত নয়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রেড নোটিশকে অনেকেই আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মনে করলেও বাস্তবে এটি সদস্যদেশগুলোর প্রতি একটি সতর্কবার্তা বা অনুরোধমাত্র। এর মাধ্যমে কোনো পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত ও সাময়িকভাবে আটক করা যায়, কিন্তু তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত।
ফলে বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও প্রত্যর্পণ নিশ্চিত হয়ে যায়নি।
যেসব নথি পাঠাতে হবে
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযোগপত্র, অভিযুক্তের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা এবং অপরাধের বিবরণ পাঠাতে হবে। প্রয়োজন হলে এসব নথি আরবি বা গ্রহণযোগ্য ভাষায় অনুবাদ ও সত্যায়িত করতে হবে। আমিরাত কর্তৃপক্ষ এসব নথি যাচাইয়ের পর আদালতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে।
আদালত কী কী বিষয় বিবেচনা করবে
প্রত্যর্পণ শুনানিতে আমিরাতের আদালত প্রথমেই যাচাই করবে, বেনজীরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমিরাতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না। আন্তর্জাতিক আইনে একে বলা হয় ‘ডুয়াল ক্রিমিন্যালিটি’।
এছাড়া আদালত আরও বিবেচনা করতে পারে: মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, একই ঘটনায় আগে বিচার হয়েছে কি না, অভিযোগ সময়সীমার কারণে অকার্যকর কি না, প্রত্যর্পণের পর অভিযুক্ত ন্যায়বিচার পাবেন কি না, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি আছে কি না,
কেন বাড়ছে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আগের অনেক পলাতক আসামির তুলনায় বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
এর অন্যতম কারণ, তিনি ইতোমধ্যে আমিরাতের হেফাজতে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে রেড নোটিশ জারির পরও অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি বা সংশ্লিষ্ট দেশ গ্রেপ্তার করেনি।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও আর্থিক অপরাধকেন্দ্রিক হওয়ায় সেগুলোকে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা তুলনামূলক সহজ হবে।
দুদকের করা ছয় মামলার মধ্যে অন্তত একটি মামলায় অভিযোগপত্রও আদালতে জমা পড়েছে। এসব নথি বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আবেদনের পক্ষে শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
আছে আইনি লড়াই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা বেশি হলেও বিষয়টি নিশ্চিত নয়। বেনজীর আহমেদের আইনজীবীরা আমিরাতের আদালতে আবেদন করে দাবি করতে পারেন, তার বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কিংবা বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শক্ত প্রমাণ, নির্ভরযোগ্য নথিপত্র এবং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সব মিলিয়ে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর পথ খুললেও শেষ সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আমিরাতের আদালতের রায় এবং দুই দেশের মধ্যে পরবর্তী আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।