ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১ অগাস্ট, ২০২৬ ১৪:৩৫ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ৩ বার
বিশ্বে জন্মের পর প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪৫ শতাংশ নবজাতক মায়ের বুকের দুধ পায়। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত কেবল মাতৃদুগ্ধ পান করানো হয় ৪৮ শতাংশ শিশুকে।
পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধ না পাওয়ার কারণে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটে।
এ পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে একমাত্র মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নবজাতক ও শিশুদের যথাযথ পুষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি এবং জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী।
মায়ের দুধের বিকল্প নেই
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ শিশুর জন্য মায়ের দুধকে সবচেয়ে উপযোগী খাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস শিশুর বেড়ে ওঠা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনের প্রধান উৎসই মাতৃদুগ্ধ।
তিনি বলেন, প্রসবের পরপরই শিশুকে শালদুধ (কলোস্ট্রাম) খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি। এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিকারী অ্যান্টিবডি থাকে। কিন্তু সিজারিয়ান প্রসবের হার বৃদ্ধি, অসচেতনতা এবং বিভিন্ন সামাজিক কারণে অনেক শিশু জন্মের পরই এই মূল্যবান দুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, একসময় পরিবার ও সমাজে শিশুদের প্রতি যত্ন বেশি ছিল। বর্তমানে শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারেও অনেক ক্ষেত্রে সেই যত্নের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম রোগীদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অনেক মা নিজের অপুষ্টির কথা ভেবে শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেন, যা কোনোভাবেই উচিত নয়। অল্প বয়সে বিয়ে, অপুষ্টি, অসচেতনতা এবং শিশুকে যথাযথভাবে বুকের দুধ না দেওয়ার কারণে শিশুদের অপুষ্টির হার বাড়ছে।
তিনি বলেন, মায়ের নিজের পুষ্টিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জন্মের পর থেকেই শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। সুস্থ ও সবল প্রজন্ম গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই।
মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত এক বছরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তিনি নির্দেশনা দিয়ে বলেন, আগামী এক বছরের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে প্রতি মাসে অন্তত একটি জেলায় সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করতে হবে। সেখানে মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, এভাবে জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সুস্থ হবে এবং শিশু মৃত্যুর হারও কমে আসবে।
জন্মের প্রথম ঘণ্টাতেই বুকের দুধ
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী হাসনাত বলেন, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত।
তিনি জানান, জন্মের পর প্রথম ৩ থেকে ৭ দিনে মায়ের যে ঘন, আঠালো ও হালকা হলুদ দুধ নিঃসৃত হয়, সেটিই শালদুধ বা কলোস্ট্রাম। এতে প্রোটিন, ভিটামিন ও অ্যান্টিবডি থাকে, যা শিশুর জীবনের প্রথম টিকার মতো কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে। এরপর দুই বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় অন্তত আটবার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোরও পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশে চিত্র
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫৫ শতাংশ মা ছয় মাস বয়স পর্যন্ত সন্তানকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ান। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)-২০২২ অনুযায়ী, এ হার বিশ্ব মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে প্রায় ৯৮ শতাংশ মায়েরই সন্তানকে একমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর ইচ্ছা থাকলেও সামাজিক, পারিবারিক ও কর্মক্ষেত্রের নানা প্রতিবন্ধকতায় অনেকেই তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না।
মাতৃদুগ্ধ পানে প্রধান বাধা
বক্তারা বলেন, ফর্মুলা দুধের আগ্রাসী প্রচারণা, পরিবারের অজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব এবং কর্মস্থলে মাতৃদুগ্ধদানের অনুকূল পরিবেশ না থাকাই সবচেয়ে বড় বাধা।
এ ছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য ব্রেস্টফিডিং কর্নার, বেবি কেয়ার সেন্টার ও মাতৃত্বকালীন সুবিধার স্বল্পতাও সমস্যা তৈরি করছে। এসব বাধা দূর করতে ঘর ও কর্মস্থলে মাতৃদুগ্ধবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিকল্প শিশুখাদ্য নিয়ন্ত্রণে আইন
দেশে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচারণা নিয়ন্ত্রণে ২০১৩ সালে আইন এবং ২০১৭ সালে বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়।
আইন অনুযায়ী, ফর্মুলা দুধের বিজ্ঞাপন, বিনামূল্যে নমুনা বিতরণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রচারণা, উপহার বা আর্থিক প্রলোভন দেওয়া নিষিদ্ধ। পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়া বিপণন এবং এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সভা-সেমিনার আয়োজনেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছয় মাস বয়সের পর শিশুকে গুঁড়া দুধের পরিবর্তে ঘরে তৈরি সুষম খাবার-যেমন চাল, ডাল, আলু ও শাকসবজি দিয়ে তৈরি খিচুড়ি-খাওয়ানো বেশি উপকারী।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য উদ্যোগ
কর্মজীবী মায়েদের সহায়তায় ইউনিসেফ ও মাতৃবান্ধব কর্মস্থল উদ্যোগের আওতায় ১০৪টি তৈরি পোশাক কারখানায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার দুগ্ধদানকারী মায়ের জন্য সহায়ক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ব্রেস্টফিডিং কর্নার, সচেতনতা কার্যক্রম এবং কর্মস্থলে মাতৃদুগ্ধদানের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
মায়ের পুষ্টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ
শুধু শিশুই নয়, প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
প্রসবের পর মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল, ক্যালসিয়াম ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণের ওপরও জোর দেওয়া হয়।
সামনে বড় লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ২০১৩ সালের আইন ও ২০১৭ সালের বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি, মাতৃদুগ্ধবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত এবং বিকল্প শিশুখাদ্যের ডিজিটাল বিপণন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধ পানের হার আরও বাড়ানো সম্ভব।
তাদের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে একমাত্র মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করা এবং প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশু মৃত্যুর হার ১২-তে নামিয়ে আনা।
সমাপনী বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মায়ের দুধ শিশুর জন্য মহান আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নিয়ামত। কোনো শিশুকে অপ্রয়োজনে এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। একটি সুস্থ, সবল ও পুষ্টিমানসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তুলতে মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই।