ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
সরকার অনুমোদিত নিবন্ধন নম্বর ১৯১
Reg:C-125478/2015

ঘরের ভেতরেই সবচেয়ে অনিরাপদ নারী

ডেস্ক রিপোর্ট


প্রকাশ: ৮ মার্চ, ২০২৬ ১৫:১৯ অপরাহ্ন | দেখা হয়েছে ১৯২ বার


ঘরের ভেতরেই সবচেয়ে অনিরাপদ নারী

‘স্বামীর হাতে মার খাওয়াটা যেন আমরার জীবনেরই অংশ হইয়া গেছে। থানায় গেলে মানুষই কইব, সংসার ভাঙবি?’ কথাগুলো বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামের রোজিনা (ছদ্মনাম)। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার তিনি। তবে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।

কারণ সমাজ, পরিবার আর সন্তানদের ভবিষ্যতের ভয় তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করে।

 

এটি রোজিনার একার গল্প নয়, দেশের অসংখ্য নারীর জীবনের সঙ্গে এ গল্পের অদ্ভুত মিল রয়েছে। এমনই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) পরিচালিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এ। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

অর্থাৎ, প্রতি চারজন বিবাহিত নারীর মধ্যে তিনজনের জীবনেই সহিংসতার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।

 

এই সহিংসতা শুধু শারীরিক নয়, এর মধ্যে রয়েছে মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। জরিপে দেখা গেছে, নারীর প্রতি সহিংসতার সবচেয়ে বড় উৎস ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অর্থাৎ স্বামী বা জীবনসঙ্গী।

জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ১৫ বছর বয়স থেকে নারীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ শারীরিক সহিংসতার এবং ২ দশমিক ২ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন নন-পার্টনার, অর্থাৎ স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিচয় ছিল পরিচিত– স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী বা পরিচিত কেউ। এ তথ্য নির্দেশ করছে, নারীর বিপদের উৎস কেবল অচেনা পুরুষ নয়, বরং পরিচিত সামাজিক পরিসরই তার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

 

যদিও ২০১৫ সালের তুলনায় সহিংসতার সামগ্রিক হার কিছুটা কমে এসেছে। সেই সময় এ হার ছিল ৬৬ শতাংশ, এখন যা ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এটি আশার আলো নয়, বরং সতর্ক থাকার কারণ।

কারণ, সহিংসতার ধরন পরিবর্তিত হলেও তার প্রভাব অপরিবর্তিত। বিশেষ করে ডিজিটাল সহিংসতা বেড়েছে।

 

জরিপ অনুযায়ী, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী অনলাইনে ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল বা নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছেন। এটি নির্দেশ করছে, প্রযুক্তির ব্যবহার সহিংসতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা নারীর নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম এ পরিস্থিতিকে ‘গভীর সামাজিক সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের সমাজে এমন একটি গভীর ও মূলগত সংস্কৃতি বিদ্যমান, যা স্বামীকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশীল হিসেবে দেখায় এবং স্ত্রীর ভূমিকাকে কেবল সহনশীল ও নীরবভাবে আবদ্ধ রাখে। এ ধরনের মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সহিংসতার জন্ম দেয় এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

banglanews24

তিনি আরও বলেন, এই মানসিকতা না বদলালে শুধু আইনের কাগজে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া যথেষ্ট নয়। বাস্তবে নারীরা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সহিংসতার শিকার হতে বাধ্য থাকবেন। সমাজের প্রতিটি স্তরে এবং পরিবারের অভ্যন্তরে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করা পর্যন্ত আইন মেনে চলা ও তার প্রয়োগ থাকা সত্ত্বেও নারীর নিরাপত্তা সত্যিকার অর্থে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই তার মতে, নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের চেতনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যা শুধু শিক্ষার মাধ্যমে নয়, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হতে পারে।

সহিংসতার আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো নীরবতা। জরিপ বলছে, সহিংসতার শিকার নারীদের ৯৩ শতাংশ কোনো আইনি পদক্ষেপ নেন না। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে মাত্র সাতজন অভিযোগ জানানোর সাহস করেন। বাকিরা সামাজিক চাপ, পারিবারিক বাধা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভয়ে নির্যাতন চুপচাপ সহ্য করে যান।

নারীপক্ষের সদস্য আইনজীবী কামরুন নাহার বলেন, অনেক নারীই জানেন না কোথায় গেলে তারা ন্যায়বিচার পাবেন কিংবা কীভাবে আইনি সহায়তা নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় গেলেও তারা কাঙ্ক্ষিত সহমর্মিতা পান না, বরং উপহাস, অবহেলা কিংবা নিরুৎসাহিত করার মতো আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে শুরুতেই অনেক নারী অভিযোগ জানাতে ভয় পান বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়াও সাধারণ মানুষের জন্য সহজ নয়, মামলা করতে গেলে সময় লাগে, বারবার আদালতে যেতে হয়, আর্থিক ব্যয়ও কম নয়। এসব কারণে অনেক নারী মনে করেন, আইনি লড়াইয়ে জড়ালে হয়ত সংসার, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা নিজের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই বাস্তবতা ও সামাজিক চাপ মিলিয়েই অধিকাংশ নারী নির্যাতনের ঘটনা চেপে যান এবং নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হন।

এদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮৬ জন। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৯ জন ও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১ জনকে। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫২ জন, তাদের মধ্যে ২৪ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৭ জন, তার মধ্যে ৫ জন কন্যাশিশু।

এছাড়াও চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৬৬ জন নারী ও কন্যাশিশু। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৬৩ জন। যৌতুকের কারণে হত্যার শিকার হয়েছেন ৬ জন। পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪ জন।

অধিকার কর্মীরা বলছেন, শুধু আইন প্রণয়ন বা কঠোর শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার নিরাপদ পরিবেশ। কারণ বাস্তবতা হলো, নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা যে ঘর, সেই ঘরই আজ তাদের অনেকের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা।

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন (২০১০) এবং পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ (১৯৮৫) প্রভৃতি একের পর এক আইনের মাধ্যমে নারীর অধিকার সুরক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই এবং এর ঘাটতি সমাজে নারীর নিরাপত্তাকে দুর্বল করে রেখেছে।

আইনজীবী ওয়ালিউর রহমান দোলন বলেন, শুধু আইন কাগজে থাকা যথেষ্ট নয়। যখন থানায় নারীবান্ধব পরিবেশ নেই, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতা এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা অনুপস্থিত, তখন নারী কখনোই নিরাপদ বোধ করতে পারবেন না।

তিনি আরও বলেন, অপরাধ দমন ও প্রতিরোধের জন্য দ্রুত ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য, পাশাপাশি থানায় প্রশিক্ষিত, সহানুভূতিশীল ও নারী সাপোর্টিং কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

এ আইনজীবী উল্লেখ করেন, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় নির্যাতনের শিকার নারীরা প্রায়শই সামাজিক আঘাত ও ভয়াবহ মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। এজন্য শুধু শাস্তিমূলক আইন প্রণয়ন নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্যাতন রোধে সমন্বিত উদ্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা নিতেই হবে।

নারীপক্ষের সদস্য আইনজীবী কামরুন নাহারের মতে, নারী নিরাপত্তা শুধু আইনের কাগজে নয়, বরং বাস্তব জীবনের প্রয়োগে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও নারীর ক্ষমতায়ন

যদিও বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, তবুও অর্থনৈতিক নির্ভরতার সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। অনেক নারী এখনো স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এর ফলে তারা প্রায়শই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। এই প্রথাগত নির্ভরতার কারণে নারীর আত্মনির্ভরতা ও স্বাধীনতার সুযোগ সীমিত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধিই সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও সমতার মূল চাবিকাঠি। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর আত্মবিশ্বাস ও নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং নারীর আর্থিক দক্ষতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি করা সমাজে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সহিংসতা কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


   আরও সংবাদ